Tuesday, 27 January 2026

শিল্পাঞ্চলে নীরব হাহাকার: দেড় বছরে বন্ধ ৩২৭ কারখানা, দিশেহারা দেড় লাখ শ্রমিক

নিজস্ব প্রতিবেদক | গাজীপুর ও সাভার 




দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত পোশাক শিল্পে বইছে অস্থিরতার ঝড় । 

গত ১৭ মাসে (২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত) শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে ছোট-বড় ৩২৭টি কারখানা । 
এতে কাজ হারিয়ে বেকারত্বের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি শ্রমিক ।

গাজীপুরে বেকারত্বের ক্ষত সবচেয়ে গভীর

শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত শুধু গাজীপুরেই ১৮৮টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে । এর ফলে কাজ হারিয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৭৯ জন শ্রমিক । এর মধ্যে স্থায়ীভাবে কারখানা বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ৯০ হাজার ৭৬০ জন ।

বেক্সিমকোর ১৩টি প্রতিষ্ঠানসহ ডার্ড কম্পোজিট, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, ক্লাসিক ফ্যাশন এবং নাসা গ্রুপের লিজ ফ্যাশনের মতো বড় বড় নামি প্রতিষ্ঠানগুলোও এই তালিকায় রয়েছে । 

সর্বশেষ ২১ জানুয়ারি বন্ধ হয়েছে বেইস ফ্যাশন লিমিটেড ।
সাভার-আশুলিয়া: ছাঁটাই ও কারখানার তালা
সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও চিত্রটি ভয়াবহ । সেখানে মোট ১৩৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার মধ্যে ৬৭টি স্থায়ী এবং ৭২টি অস্থায়ীভাবে তালাবদ্ধ । 

বেকার হয়েছেন প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক। জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন, বসুন্ধরা গার্মেন্টস এবং সিঙ্গার রেফ্রিজারেটরের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও উৎপাদনের চাকা থমকে গেছে।

কেন এই ধস?

শিল্প পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতে, কারখানা বন্ধের পেছনে একাধিক কারণ দায়ী:

 * জ্বালানি সংকট: গ্যাস ও বিদ্যুতের অপর্যাপ্ত সরবরাহ উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ।

 * আর্থিক সংকট: ব্যাংকিং খাতের অসহযোগিতা ও ঋণের অভাবে মূলধন সংকট তৈরি হয়েছে ।

 * ক্রয়াদেশ বাতিল: বৈশ্বিক মন্দার কারণে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার কমে যাওয়া বা বাতিল হওয়া ।

 * রাজনৈতিক অস্থিরতা: গত কয়েক মাসের টানা অস্থিরতা এবং শ্রমিক অসন্তোষ শিল্প মালিকদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে ।

> শ্রমিকদের আর্তি: > "আগে নির্দিষ্ট তারিখে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতন আসত। এখন এক বেলা খেলে অন্য বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। বড় কারখানায় কাজ করার গর্ব এখন শুধুই অতীত।"
> — আলেয়া আক্তার, সাবেক শ্রমিক, নাসা গ্রুপ।

স্থানীয় অর্থনীতিতে ধস ও বাড়ছে অপরাধ

কারখানা বন্ধের প্রভাবে শুধু শ্রমিক নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় বাড়ির মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও । 
গাজীপুরের কাশিমপুর ও আশুলিয়ার জামগড়ার মতো এলাকায় হাজার হাজার শ্রমিক পরিবার গ্রামমুখী হওয়ায় বাসা ফাঁকা পড়ে আছে । 

ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাড়ি করা মালিকরা এখন দিশেহারা ।
এদিকে, কাজ হারিয়ে শ্রমিকদের একটি অংশ দিনমজুরি বা রিকশা চালনার মতো পেশা বেছে নিলেও, পর্যাপ্ত কাজ মিলছে না । 

শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, বেকারত্বের এই অভিশাপ অনেককে বাধ্য করছে অপরাধ জগতের পথে পা বাড়াতে।

উত্তরণের পথ কী?

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোটের নেতারা বলছেন, নতুন কারখানা গড়ে না ওঠায় এবং চালু কারখানাগুলোতে ছাঁটাই অব্যাহত থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে । 

শিল্প পুলিশ ও ব্যবসায়ী বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত জ্বালানি সংকট সমাধান এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা দূর না করলে এই বেকারত্বের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে ।

No comments:

Post a Comment