শেরপুরে ‘অস্ত্র উদ্ধারের’ নাটক: নিরাপরাধ ব্যবসায়ীকে ফাঁসানোর নেপথ্যে কি পুলিশ-সেনাবাহিনী?


শেরপুরে ‘অস্ত্র উদ্ধারের’ নাটক: নিরাপরাধ ব্যবসায়ীকে ফাঁসানোর নেপথ্যে কি পুলিশ-সেনাবাহিনী?

নিজস্ব প্রতিবেদক | শেরপুর

শেরপুর সদর উপজেলার সাপমারী এলাকায় এক বিশেষ অভিযানে অবৈধ শটগানসহ হারেজ আলী নামের এক ব্যবসায়ীকে আটকের ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, এটি কোনো প্রকৃত অভিযান নয়; বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও চাঁদাবাজির জেরে সাজানো একটি ‘অস্ত্র উদ্ধারের নাটক’। এ ঘটনায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

কে এই হারেজ আলী?

স্থানীয়দের তথ্যমতে, হারেজ আলী একজন শান্তপ্রিয় ও সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। অতীতে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা ঝগড়া-বিবাদের রেকর্ড নেই। তার দুই ভাই সরকারি চাকরিজীবী—একজন সেনাবাহিনীতে এবং অন্যজন বিজিবিতে কর্মরত। এলাকায় সচ্ছল ও সম্মানের সঙ্গে বসবাস করাই যেন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঘটনার নেপথ্যে চাঁদা দাবি ও হুমকি

হারেজ আলীর পরিবার অভিযোগ করেছে, ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর স্থানীয় বিএনপি নেতা ছানোয়ার হোসেন ছানু ও মোস্তাফিজুর রহমান মুক্তা তার কাছে ৮০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে তার দুই ভাইয়ের সরকারি চাকরি খেয়ে ফেলারও হুমকি দেওয়া হয়। হারেজ আলী চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গত বছরের জুলাই মাসে তার রড-সিমেন্টের দোকান ভাঙচুর করা হয় এবং ক্যাশবাক্স থেকে দেড় লাখ টাকা লুটে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে তার নামে থানায় একটি মামলা দায়ের করা হলেও পুলিশি তদন্তে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয় বলে পরিবারের দাবি।

অস্ত্র উদ্ধার নাকি সাজানো নাটক?

পরিবারের অভিযোগ, আগের মামলায় ফাঁসাতে না পেরে এবার পরিকল্পিতভাবে ‘অস্ত্র নাটক’ সাজানো হয়েছে। ঘটনার দিন প্রায় ৭০ জন পুলিশ ও সেনাসদস্য ৮টি গাড়ি নিয়ে হারেজ আলীর বাড়ি ঘেরাও করে।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, অভিযানের সময় স্থানীয়দের জিম্মির মতো অবস্থায় রাখা হয় এবং হারেজ আলীর বৃদ্ধা মাকে ঘরে আটকে রাখা হয়। পরে তাদের পুরনো বাড়ির জঙ্গলে থাকা একটি পরিত্যক্ত পানির ট্যাংক থেকে অস্ত্র উদ্ধার দেখানো হয়। 

এলাকাবাসীর প্রশ্ন—যে মানুষটি অস্ত্র চালাতেই জানেন না, তার বাড়িতে পুলিশের দাবি অনুযায়ী ‘লুট হওয়া অস্ত্র’ এলো কোথা থেকে?

পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা

ঘটনার পর হারেজ আলীর বৃদ্ধা মা বিচার চেয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশের দপ্তরে যোগাযোগ করছেন। তবে দুই বাহিনীর বক্তব্যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সেনাবাহিনী বলছে বিষয়টি পুলিশ জানে, আর পুলিশ বলছে অভিযোগ সেনাবাহিনীর কাছে।

এ নিয়ে সাপমারী এলাকায় ‘চোর-পুলিশ’ খেলা চলছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। একজন ব্যবসায়ীকে ধরতে ম্যাজিস্ট্রেটসহ এত বড় বাহিনীর প্রয়োজন কেন হলো—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এজাহার নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে হারেজ আলী নিজ হাতে অস্ত্র বের করে দিয়েছেন। অথচ প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই ট্যাংক থেকে অস্ত্রটি উদ্ধার করেছেন।
মামলার আগে টাকার লেনদেন হয়েছে বলেও এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। বর্তমানে হারেজ আলীকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, যা একজন নিরপরাধ মানুষের ওপর চরম অবিচার বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এলাকাবাসীর দাবি

এলাকাবাসীর দাবি, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া একজন সৎ ব্যবসায়ীকে অস্ত্র মামলায় ফাঁসানো দেশের আইনের শাসনের চরম লঙ্ঘন। এই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত ঘটনার উন্মোচন, হারেজ আলীর মুক্তি এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

Post a Comment

0 Comments