নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের পর প্রায় আঠারো মাস কেটে গেলেও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমানের খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার ব্যবস্থাপনা মূলত বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে গড়ে তোলা মজুদ সক্ষমতা এবং সেই আমলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।
খাদ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত দেড় বছরে নতুন কোনো সাইলো নির্মাণ বা মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর বড় প্রকল্প নেওয়া হয়নি। আগের সরকারের রেখে যাওয়া ২০ থেকে ২২ লাখ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম ও বাফার স্টক (আপৎকালীন মজুদ) ব্যবহার করেই বর্তমানে জাতীয় চাহিদা মেটানো হচ্ছে।
মজুদ সক্ষমতার ধারাবাহিকতা
খাদ্য বিভাগের তথ্যমতে, শেখ হাসিনা সরকারের শেষ মেয়াদে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ সক্ষমতা ২১ লাখ মেট্রিক টনের বেশিতে উন্নীত করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় নির্মিত আধুনিক সাইলো এবং গুদামগুলোই এখন জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেই সময়ে নেওয়া পরিকল্পনা ছিল মূলত ১৮ থেকে ২৪ মাসের আগাম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, যার সুবিধা বর্তমান সরকার ভোগ করছে।
সাবেক এক কৃষি সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদি নীতির ফল। বর্তমানে আমরা যে স্থিতিশীলতা দেখছি, তা মূলত বিগত ৫-৭ বছরে গড়ে তোলা সরবরাহ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোর সুফল। গত ১৮ মাসে নতুন করে সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বড় উদ্যোগ দেখা যায়নি।’
পরীক্ষিত কাঠামোয় সংকট মোকাবিলা
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের খাদ্য সংকট সামাল দেওয়ার পেছনে ছিল তৎকালীন দূরদর্শী ‘বাফার স্টক’ নীতি। বর্তমানেও ওএমএস, টিসিবি এবং ভিজিডি-ভিজিএফের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে চাল ও গম সরবরাহের ক্ষেত্রে সেই পুরোনো কাঠামোরই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হচ্ছে।
নতুন উদ্যোগের ঘাটতি ও ঝুঁকি
খাদ্য অধিদপ্তরের সূত্রমতে, গত দেড় বছরে খাদ্যশস্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে রুটিন কাজের বাইরে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং আগের সরকারের সময়ে করা ‘জি-টু-জি’ চুক্তির আওতায় আসা চাল ও গম দিয়েই মজুদ ঠিক রাখা হয়েছে। নতুন করে সক্ষমতা বাড়ানোর মেগা প্রকল্প বা ধান সংগ্রহের আধুনিক কোনো পদ্ধতি চালু করতে দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, পুরোনো মজুদের ওপর অনির্দিষ্টকাল নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন আন্তর্জাতিক উৎস খোঁজা এবং মজুদ সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের মতে, গত দেড় বছরে বড় কোনো সংকট না হওয়ায় পুরোনো ব্যবস্থায় কাজ চললেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না।
0 Comments